দেশের বৃহত্তম রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে অবস্থানরত রুহুল আমিন নামে এক মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক পরিচয় প্রদানকারী ব্যাক্তির সাথে চিহ্নিত এক মাদক ব্যবসায়ীর কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পূনম মৃধা নামে এক নারীর ফেসবুক আইডি থেকে ওই অডিও রেকর্ডটি শেয়ার করা হলে তোলপাড় শুরু হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে তা ব্যাপক শেয়ার ও নানা কমেন্ট করতে থাকেন নেটিজেনরা। অডিও রেকর্ডে শোনা যায় রুহুল আমিন দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর প্রভাবশালী বাড়িয়ালী ও মাদক ব্যবসায়ী লাইলী বাড়ীওয়ালীর ভাই অপর মাদক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর নামে একজনের সাথে কথা বলছেন।
লাইলি,রিনা রোজী, জাহাঙ্গীর সহ দৌলতদিয়া যৌনপল্লী ও পুড়াভিটা এলাকার প্রভাবশালী কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী বর্তমানে পলাতক রয়েছে। সম্প্রতি দৌলতদিয়া পুড়াভিটায় মাদক বিরোধী অভিযান চলাকালে তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, গোয়ালন্দের এসিল্যান্ডের উপর হামলা চালিয়ে গ্রেফতারকৃত এক মাদক ব্যবসায়ীকে ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় মামলা হলে তারা বেকায়দায় পড়ে যায়।
এদিকে কথোপকথনে জাহাঙ্গীর রুহুল আমিনকে বলেন,তিনি কুষ্টিয়ায় পলাতক থেকে টুকটাক মাদক ব্যবসা করে কোন মতো চলছেন। তিনি দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে ফিরতে চান। সেজন্য তিনি প্রয়োজনীয় খরচ দিতে রাজি। এর প্রতি উত্তরে রুহুল আমিনকে বলতে শোনা যায়, "গোয়ালন্দ ঘাট থানা, ডিবি পুলিশ,র্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সবাই তার কথা শোনে। এমনকি কেউ তাকে (জাহাঙ্গীর) গ্রেফতার করতে আসলেও আমার নাম বলবেন, দেখবেন সাথে সাথে ছেড়ে দিবে। তাছাড়া ডিবির ওসি নিয়মিত তার সাথে লাঞ্চ করতে অপেক্ষা করেন। গতকালও মুঘল হোটেলে একসাথে খেলাম।"
জাহাঙ্গীর বলেন, আপনি সবাইরে ম্যানেজ করেন আমি আপনার ব্যাপারটা দেখব। আমি ফিরতে পারলে আমার সাথে সাথে আপনিও লাভবান হবেন।এরপর জাহাঙ্গীর আপাতত কিছু টাকা পাঠানোর জন্য বিকাশ বা নগদ নাম্বার চাইলে রুহুল তার নাম্বারটি দেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রুহুল আমিনের বাড়ি ফরিদপুর জেলার ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের কাচারিরটেক এলাকায়।
তবে তিনি অবস্থান করেন যৌনপল্লীর ভিতর এক মহিলার সাথে। ইতিপূর্বে তিনি ফরিদপুরে একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। সেখানে সেখানে টাকা আত্মসাৎ করার দায়ে তার বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয়। পরবর্তিতে তিনি দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে এসে থিতু হন। ২০২৫ সালের ১৬ জুন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন এর প্যাডে তৎকালীন গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি রাকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তৎকালীন উপদেষ্টা বরাবর লিখিত অভিযোগ করে আলোচনায় আসেন। এরপর গোয়ালন্দে আলোচিত নুরাল পাগলার পাক দরবার শরীফ পুড়ানোর ঘটনায় তৎকালীন ওসি এবং এসপিকে বদলি করা হলে তার ক্রেডিট সে নিজের বলে প্রচার করে যৌনপল্লীতে। এরপর থেকে তিনি পল্লীতে প্রভাবশালী একজনে পরিনত হন। পল্লীতে নতুন ভর্তি হওয়া মেয়েদের থেকে কমিশন আদায়, কাউকে গ্রেফতার বা ছাড়ানোর তদবির সহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে তিনি সুবিধা আদায় করে থাকেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী থেকে একটা সময় তিনি দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন নামের একটি পত্রিকার গোয়ালন্দ উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত হন। তবে ক্রাইম জোন দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে নিয়মিত অবস্হান করলেও সেখানকার উল্লেখযোগ্য কোন সংবাদ তাকে কখনোই করতে দেখা যায় নি বলে স্হানীয়দের অভিযোগ।
এদিকে অডিও ভাইরাল হওয়ার পর রুহুল আমিন পুনম মৃধাকে ফোন করে দাবি করেন রেকর্ডিংটা এআই দিয়ে করা হয়েছে। ওটা তার কন্ঠ না। তবে এ আই দিয়ে কল রেকর্ড করা যায় কিনা প্রশ্ন করলে রুহুল আমিন কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ভাইরাল অডিও কন্ঠের রুহুল আমিন এবং জাহাঙ্গীর কাউকেই তিনি চেনেন না।
রাজবাড়ী জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ওসি মফিজুল ইসলাম বলেন, তার নাম ব্যবহার করে কেউ যদি কোথাও কোন গাল গল্প বা অপরাধমূলক কাজ করে থাকে তার দায়তো আমার নয়। তবে আমার বা অন্য কোন কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে কেউ যদি অপরাধ করে এবং তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায় তবে তদন্ত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। কল রেকর্ডটি তিনি শুনেছেন। ওটাও পরিকল্পিত বলে তার মনে হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।